দেশের রফতানি খাত ও ডিজিটাল বাণিজ্যের প্রসারে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের ক্ষুদ্র, মাঝারি ও উদীয়মান উদ্যোক্তাদের বৈশ্বিক বাজারে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের শিথিলতা আনা হয়েছে।
সোমবার (১৫ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ পলিসি ডির্পাটমেন্ট থেকে জারি করা এক সার্কুলারে এই নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়। এর ফলে এখন থেকে বাংলাদেশি রফতানিকারকরা আন্তর্জাতিক অনলাইন মার্কেটপ্লেস ও ই-commerce প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারবেন।
নতুন নির্দেশনার মূল আকর্ষণসমূহ:
-
৫ হাজার ডলার পর্যন্ত রফতানিতে বিশেষ সুবিধা: প্রতি চালানে সর্বোচ্চ ৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া অত্যন্ত সহজ করা হয়েছে। ১ হাজার ডলার পর্যন্ত চালানের সম্পূর্ণ মূল্য অগ্রিম পরিশোধিত হলে প্রচলিত ইএক্সপি (EXP) ফরম পূরণের কোনো বাধ্যবাধকতা থাকবে না।
-
ডাইরেক্ট-টু-কনজিউমার (D2C) মডেল: এখন থেকে সরাসরি বিদেশি ক্রেতার নামেই পরিবহন বা শিপিং ডকুমেন্ট ইস্যু করা যাবে। ফলে আন্তর্জাতিক ই-কমার্সের অন্যতম প্রধান শর্ত পূরণ করা সহজ হবে, যা এতদিন বড় বাধা ছিল।
-
প্ল্যাটফর্ম ফি পরিশোধের সুবিধা: আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসের সাবস্ক্রিপশন বা মেম্বারশিপ ফি বৈধ উপায়ে বিদেশে পাঠানো যাবে। ইআরকিউ (ERQ) অ্যাকাউন্টে ডলার না থাকলে বছরে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত সাধারণ অ্যাকাউন্ট থেকেও পাঠানো যাবে।
-
সহজ রিফান্ড ব্যবস্থা: অনলাইন বাণিজ্যে পণ্য ফেরত বা মানগত অভিযোগের ক্ষেত্রে ক্রেতাকে অর্থ ফেরত (Refund) দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য অবারিত সুযোগ
দেশে বর্তমানে হস্তশিল্প, চামড়াজাত পণ্য, পাটপণ্য, হোম টেক্সটাইল, জুয়েলারি ও নকশিকাঁথাসহ বিভিন্ন সৃজনশীল খাতের হাজার হাজার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা রয়েছেন। আগে জটিল ব্যাংকিং ও রফতানি প্রক্রিয়ার কারণে তারা বিশ্ববাজারে পৌঁছাতে পারতেন না। নতুন নীতিমালার ফলে একজন উদ্যোক্তা এখন ঘরে বসেই আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে নিজের পণ্য প্রদর্শন ও অর্ডার গ্রহণ করতে পারবেন।
বৈদেশিক মুদ্রা আনার বাধ্যবাধকতা: বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট জানিয়েছে, রফতানি আয় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল বা অনুমোদিত ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশে আনতে হবে। একই সাথে অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলোকে (AD) অর্থপাচার প্রতিরোধে প্রতিটি লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে।
ব্যবসায়ীদের প্রতিক্রিয়া ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন:
“এটি বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। রফতানি প্রক্রিয়ায় কাগজপত্র ও আনুষ্ঠানিকতা কমিয়ে আনায় এটি নতুন প্রজন্মের ডিজিটাল ব্যবসায়ীদের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের দ্বার উন্মুক্ত করবে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে।”
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বব্যাপী দ্রুত বর্ধনশীল ই-কমার্স বাজারের সুবিধা নিতে এই নীতি অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এর মাধ্যমে তৈরি পোশাক, হস্তশিল্প ও পাটপণ্যের মতো খাতগুলো যেমন বিকশিত হবে, তেমনই রফতানি বহুমুখীকরণের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাবে।

M NEWS 365 ডেস্ক 























