চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় যৌতুকের দাবিতে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর পেটে লাথি মেরে গর্ভের সন্তানকে (ভ্রূণ) হত্যার অভিযোগ উঠেছে এক পাষণ্ড স্বামীর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী গৃহবধূ শিখা খাতুন (১৮) বাদী হয়ে বুধবার (৩ জুন) দিনগত রাত ১০টার দিকে জীবননগর থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলা দায়েরের পরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত স্বামী বিপ্লবকে (২৪) গ্রেফতার করেছে। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার কয়া গ্রামের দক্ষিণ পাড়ায়।
জীবননগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. সোলায়মান শেখ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
বিয়ের পর থেকেই চলছিল যৌতুকের নির্যাতন
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, কয়া গ্রামের সাহাবুলের ছেলে বিপ্লবের সাথে একই গ্রামের সাইফুল ইসলামের মেয়ে শিখা খাতুনের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই বিপ্লব তার স্ত্রীর কাছে যৌতুক হিসেবে নগদ টাকা, মোটরসাইকেল ও মোবাইল ফোন দাবি করে আসছিল। দরিদ্র বাবার পক্ষে এসব দাবি পূরণ করা সম্ভব না হওয়ায় শিখা খাতুনের ওপর প্রায়ই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো।
যেভাবে কেড়ে নেওয়া হলো অনাগত সন্তানের প্রাণ
ভুক্তভোগী শিখা খাতুন হাসপাতালের শয্যায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, তিনি সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। গত ২৬ মে রাতে প্রথম দফায় যৌতুকের দাবিতে তার ওপর ব্যাপক শারীরিক নির্যাতন চালায় এবং পেটে লাথি মারে স্বামী বিপ্লব। পরবর্তীতে গত ৩১ মে দিনগত রাত ১০টার দিকে বিপ্লব বাজার থেকে বাড়ি ফিরে আবারও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে এবং এক লাখ টাকা, একটি মোটরসাইকেল ও একটি মোবাইল ফোন দাবি করে।
শিখা খাতুন তার বাবার দরিদ্রতার কথা উল্লেখ করে এই দাবি পূরণে অসমর্থতা জানালে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে বিপ্লব। সে শিখাকে বেধড়ক মারধর করে এবং অত্যন্ত জোরে তার পেটে লাথি মারে। এতে শিখা গুরুতর অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
ভুক্তভোগী শিখা খাতুন বলেন: “আমার স্বামী আমার বাবার আর্থিক অবস্থা জেনেশুনেই বিয়ে করেছিল। কিন্তু বিয়ের পর থেকেই টাকার জন্য চাপ দিত। ঘটনার দিন পেটে লাথি মারার পর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। হাসপাতালে নেওয়ার পর জানতে পারি আমার সাত মাসের সন্তান আর বেঁচে নেই।”
আল্ট্রাসনোগ্রামে মিলল মৃত সন্তান
ঘটনার পর স্বজন ও স্থানীয়রা শিখাকে উদ্ধার করে জীবননগরের একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে ভর্তি করেন। গত ১ জুন বিকেলে জীবননগর মনোয়ারা সনো সেন্টারে আল্ট্রাসনোগ্রাম করা হলে চিকিৎসক জানান, গর্ভের সন্তানের কোনো হার্টবিট (হৃদস্পন্দন) পাওয়া যাচ্ছে না। এরপর চিকিৎসক তাকে এক ঘণ্টা অক্সিজেন দিয়ে আবারও আল্ট্রাসনোগ্রাম করেন, কিন্তু তখনও কোনো হার্টবিট মেলেনি। পরবর্তীতে বুধবার (৩ জুন) সকাল ১১টার দিকে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে শিখা খাতুন একটি মৃত সন্তান প্রসব করেন।
পুলিশের পদক্ষেপ ও স্থানীয়দের ক্ষোভ
এ বিষয়ে জীবননগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. সোলায়মান শেখ বলেন, “এ ঘটনায় শিখা খাতুন বাদী হয়ে তার স্বামী বিপ্লবের বিরুদ্ধে থানায় একটি ভ্রূণ হত্যা মামলা করেছেন। মামলার পরপরই অভিযান চালিয়ে আমরা অভিযুক্ত বিপ্লবকে গ্রেফতার করেছি।”
এদিকে যৌতুকের দাবিতে একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীর ওপর এমন নির্মম ও অমানবিক নির্যাতনের ঘটনায় পুরো এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনায় জড়িত পাষণ্ড স্বামীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

আকিমুল ইসলাম, চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি 





















